বুধবার, ২২ মার্চ ২০২৩, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প || রুম্পা রুমানা

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প || রুম্পা রুমানা / ১২৫ বার
আপডেট : শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২১
ঘুরে_দাঁড়ানোর_গল্প_||_রুম্পা_রুমানা

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প || রুম্পা রুমানা: বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে জব্বার শুয়ে আছে বউয়ের পাশে। ক্লান্ত বউকে কিছু বলা যাবে না। দুঃশ্চিন্তা বাড়বে। তার ইচ্ছে বউ স্বাবলম্বী হোক। গার্মেন্টসের কাজটা করুক। এতে সময়ও কাটবে।

সংসারেও স্বচ্ছলতা আসবে। প্রয়োজনে এলাকা ত্যাগ করবে। তবুও রমিজের ভয়ে ঘরে আটকাবে না বউকে। বস্তিতে ফেরার সময় রমিজ প্রতিদিন তাকে অপদস্ত করে। ভয়ে জব্বার কিছু বলতে পারে না। রাতে ঘরে ফিরে ভেতরে কান্না লুকিয়ে স্ত্রীর সাথে অভিনয় করে। প্রতিদিনের মতোন স্বাভাবিক কথা বার্তা বলে খেয়ে ঘুমাতে যায়। শিউলির হাত বুকের কাছে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম উধাও হয়ে যায়। তবুও ঘুমের ভান করে চুপচাপ শুয়ে থাকে। শিউলি টুকটাক কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে যায় ।ঘুমাক। সারাদিন ধকল যায় খুব। ওর ঘুম দরকার। সকালে উঠে দুজনের খাবার বানাবে। একটু আগে না ঘুমালে শরীর খারাপ হবে।

জব্বার ভাবে শিউলিকে ফাঁকি দিয়ে একটু কাঁদলে কি তার মন খারাপ কাটবে। পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না। কাঁদলে কোমলতা প্রকাশ পায়। যা পুরুষত্বের বিপরীত আচরণ। হেমন্ত গিয়ে শীত চলে এসেছে। গ্যারেজে রিক্সা জমা করে ঘরে ফিরতে ফিরতেই রাত দশটা বাজে। তাই বিকেলেই শাহবাগ থেকে চার গোছা কাঁচের চুড়ি,চুলের রঙিন ফিতা, এক শিশি আলতা কিনে রেখেছে। চুড়িগুলো ভেঙে যাবার শঙ্কায় পরিচিত টং দোকানে রেখে দিয়েছিলো।ওগুলো চাদরের নিচে নিয়ে বস্তিতে ফেরার গলিতে ঢুকতেই পথ আটকে ফেলে রমিজ। বস্তিবাসী যাকে রমিজ গুন্ডা নামে চেনে।

“কিরে জব্বাইরা,খুব যে দেহি উতলা? প্যাকেটে কি?” জব্বার জানে, এরপরই তার বউয়ের প্রসঙ্গ তুলবে রমিজ। কাজে না যাওয়ার পরামর্শ শোনাবে। কয়েক মাস ধরে শিউলির দিকে কুনজর পড়েছে রমিজের। প্রভাবশালী এক নেতার ফরমায়েশ খাটে। এলাকায় গুণ্ডাপাণ্ডা নিয়ে ঘুরে। মেয়েদের উত্যক্ত করাই এদের কাজ। ইদানিং রাত-দুপুরে জব্বারের ঘরের চালে ঢিল দেয়। বাইরে থেকে দরজায় শিকল তুলে রাখে, কাজে যাওয়ার পথে শিউলির পথ আগলে দাঁড়ায়। জব্বার দ্রুত পাশ কেটে চলে যাওয়ার আগেই রমিজের হাতে আটকে গেল হাত। “কলিজা বড় লাগতাছে যে? কই যাস? দে, প্যাকেট দে।” জব্বার শক্ত করে আকড়ে ধরে চুড়ি-ফিতা-আলতার প্যাকেট।

আজ তাদের দ্বিতীয় বিয়ে বার্ষিকী।বউয়ের শরীর খারাপ যাচ্ছে। তার দ্রুত ফেরা উচিত। হোটেল থেকে খাবার কিনে নিয়ে ঘরে ফিরেই বউয়ের পায়ে আলতা লাগাবে , চুড়ি তুলবে হাতে। শিউলির উচ্ছল মুখ দেখে সারাদিনের ক্লান্তি মুছে যাবে।এমন সব ভাবনাতেই দিন কেটেছে।

রমিজের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে চুড়ি-আলতার প্যাকেট ছিটকে গিয়ে পড়ে রাস্তায়। ইটের উপর। সে ভ্রান্তের মতোন আধো আলোতে হাতড়ে প্যাকেট খুলে।

ততক্ষণে লাল রঙে ভিজে গেছে কাগজের সাদা প্যাকেট। আলতার শিশি ভেঙেছে, চুড়িগুলোও খণ্ড-বিখণ্ড। চোখ দিয়ে কি নামছে ! জল না হৃদয়ক্ষরণ!

জব্বার উঠে দাঁড়ায়। পাশ থেকে শোনা যায় রমিজের অনুশোচনাবিহীন কর্কশ হাসি ! “মজনু হইছিস? আইজ তর বউরে ধইরা নিয়া যামু ।” উদ্ভ্রান্ত জব্বার ইট ছুঁড়ে দেয় রমিজের পুরুষাঙ্গ বরাবর। রমিজ পালিয়ে যেতে যেতে দেখে জব্বার হাসছে পৃথিবী কাঁপিয়ে। যে হাসিতে স্ত্রীকে আগলে রাখা জব্বারের বিজয়গর্ব মিশে আছে। ফসকে যাওয়া বিরিয়ানির প্যাকেট ছিঁড়ে ফেলেছে কুকুর। জব্বারের তাতে আক্ষেপ নেই। খাবার তো কিনে নিতে পারবে। কিন্তু এতো রাতে আলতা- চুড়ি কোথায় পাবে!

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।


এ জাতীয় আরো সংবাদ